যেভাবে হরমুজ অতিক্রম করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’

যেভাবে হরমুজ অতিক্রম করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’
নিউজ ডেস্ক
২৪ জুন ২০২৬, ১২:০২ পিএম

ইরান যুদ্ধের কারণে প্রায় চার মাস পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় আটকে থাকার পর বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।


রোববার (২১ জুন) জাহাজটি ৩১ জন নাবিক ও প্রকৌশলীসহ বাংলাদেশ সময় ভোর রাত ৩টার কিছু পরে নিরাপদে প্রণালিটি পাড়ি দেয়।


বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাহাজটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বের হতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের পতাকাবাহী এই জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিলেও শিগগিরই দেশে ফিরছে না।


জাহাজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘসময় সমুদ্রে অবস্থানের কারণে জাহাজের তলদেশে শ্যাওলা জমেছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করছে।


জাহাজটিতে থাকা নাবিকরা এই যাত্রাকে একটি দুঃসাহসিক ও ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের বন্দিদশার অবসান হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই একটি মৃত্যুকূপের ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছি আমরা।’


নাবিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনও কখনও বিধ্বস্ত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আশপাশের জাহাজে পড়তেও দেখেছেন তারা, যা পুরো সময়টিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল।


বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে। এরপর জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে পণ্য খালাসের পরও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল।


ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির পর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এ পরিস্থিতিতে এমভি বাংলার জয়যাত্রা তিন দফায় প্রণালিটি অতিক্রমের চেষ্টা চালালেও নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রতিবারই ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল দূরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ অ্যাঙ্কারেজে নোঙর করে অবস্থান নেয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রয়োজনীয় অনুমতির অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করতে হয় জাহাজটিকে।


জাহাজটির একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমাদের জাহাজ অপারেট করে সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানি। তারা আমাদের জানায় যে, ভারবালি হরমুজ পাড়ি দেওয়ার অনুমতি পাওয়া গেছে। তোমরাও মুভ করতে পারো। প্রাথমিকভাবে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর হরমুজ প্রণালি পাড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় সোমবার সকালেই।’


বিএসসির এমডি কমডোর মাহমুদুল মালেক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘যেহেতু আমরা আরও কয়েকটি জাহাজের মুভমেন্ট দেখতে পারছিলাম মেরিন ট্রাফিক ওয়েবসাইটে। সে কারণে আমরাও মুভমেন্ট করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন আমি আমাদের ক্যাপ্টেনকে বললাম হরমুজ প্রণালির দিকে মুভ করতে।’


তিনি জানান, হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়া জাহাজগুলোর জন্য এই প্রণালি পাড়ি দেওয়ার জন্য দুইটি অপশন ছিল। প্রথমত ইরানের চাহিদামাফিক টোল দিয়ে হরমুজ পাড়ি দেওয়া। দ্বিতীয়ত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসা।


তিনি এরও বলেন, ‘আমরা দেখলাম কেউ কেউ টোল দিয়ে বের হয়ে আসছে। আমাদের টোল দেওয়ার টাকাও ছিল। কিন্তু আমরা যদি ইরানকে টোল দেই তাহলে আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশনেরও শঙ্কা ছিল। যে কারণে আমাদের অনেকটা কৌশলে সেখান থেকে রেব হয়ে আসার রাস্তা খুঁজতে হয়েছে। এবং আমরা সফল হয়েছি।’


জাহাজটিতে থাকা নাবিকেরা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ফিরে যেতে হতে পারে এমন আশঙ্কার জায়গা থেকে জাহাজটি শুরুতে অনেক ধীর গতিতে চলছিল।


বাংলার জয়যাত্রায় থাকা নাবিকেরা বিবিসি বাংলাকে জানান, সোমবার রাতেই হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি। যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম (টিএসএস) বা নৌযান চলাচল পৃথকীকরণ ব্যবস্থা চালু হয়। এই টিএসএস’র মধ্যেই যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সামুদ্রিক মাইন স্থাপন করে ইরান।


বাংলার জয়যাত্রার চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমরা টিএসএস দিয়ে আসতে পারিনি। সে কারণে আমাদের পাড়ি দেওয়ার পথটি ছিল আরেকটু বেশি। যদি টিএসএস দিয়ে আসতাম তাহলে ২৫ নটিক্যাল পথ পাড়ি দিলেই হতো। কিন্তু এবার আমাদের পুরোটা হরমুজের ৩৫ নটিক্যাল মাইল পথ।’


তিনি জানান, বাংলার জয়যাত্রা যখন হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিচ্ছিল তখন কাছাকাছি দূরত্বে সব মিলিয়ে তিন থেকে চারটি জাহাজ ছিল। হরমুজ পাড়ি দেওয়ার সময় সে সময় ইরানের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে রেডিও ঘোষণা তারা শুনতে পেয়েছিলেন যে, কোনো ধরনের মিলিটারি জাহাজ প্রণালি দিয়ে পার হতে গেলে গুলি করা হবে।


পরে সাড়ে ৩ ঘণ্টার চালিয়ে যখন বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ অতিক্রম করে তখন বাংলাদেশের সময় ভোর রাত সাড়ে ৩টা। হরমুজ থেকে বের হয়ে সাড়ে ৩টার কিছু পড়ে বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, ‘দীর্ঘ অপেক্ষার পর আমরা নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছি। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’