ইবি ছাত্রীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেল
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এক ছাত্রীকে আপত্তিকর ও যৌন হয়রানিমূলক ঘটনায় অভিযুক্ত অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে। অভিযুক্তের নাম— নুর ইসলাম। শৈলকূপা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের শাহেব আলি মুন্সীর সন্তান।
অভিযুক্ত নুর ইসলাম শেখপাড়া রাহাতন নেছা স্কুল এন্ড কলেজে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। এর আগে গোবিন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি যুবদলের কর্মী এবং শৈলকূপা থানা ও ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সহ সভাপতি নজরুল জোয়ার্দারের অনুসারী বলে একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তারা তিন ভাই। তিনি বর্তমান দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হয়ে সংসার করছেন। এর আগে প্রথম বিয়েটা সাংসারিক বিচ্ছেদ ঘটে। এদিকে কর্মস্থল রাহাতন নেছা স্কুল এন্ড কলেজের সিসিটিভি ফুটেজে গতকাল (১ জুলাই) সকাল ১০ টা ৪৮ মিনিটে স্কুল থেকে বের হয়েছে, প্রবেশ করে ১১ টা ১৮ মিনিটে। তার এই অস্বাভাবিক আসা-যাওয়া সম্পর্কে পূর্বে প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়নি বলে দাবি স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষের। দরখাস্ত দিয়ে একদিনের ছুটিও নিয়েছে অভিযুক্ত নুর ইসলাম।

ভুক্তভোগীর অভিযোগপত্র
রাহাতন নেছা স্কুল এন্ড কলেজের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৈতিক স্খলনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। তাকে নিয়ে কয়েকবার বিদ্যালয়ে সালিশও হয়েছে। শৈলকূপার বিএনপি নেতা নজরুল জোয়ার্দার জিম্মিদার হয়ে মীমাংসা করেছিলেন। শিক্ষকরা জানান, “আমাদের বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি নজরুল জোয়ার্দার ভাই প্রশ্রয় দিবে না।”
গোবিন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাহার উদ্দিন জানান, “নূর ইসলাম নামক ছেলেটা স্কুলে পড়া অবস্থায়ও নারী ঘটিত কারণে বহিষ্কার করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত স্কুলে ক্লাস করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে শুধু বোর্ড পরীক্ষা দিয়েছেন। এখন বড় হয়ে চাকুরি জীবনে প্রবেশ করেছে, কোথাও কী করছে আর তো বলতে পারছি না।”

অধ্যক্ষ, রাহাতন নেছা স্কুল এন্ড কলেজ
রাহাতন নেছা স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, “নুর ইসলাম গতকাল তড়িঘড়ি করে একদিনের ছুটি নিয়ে গেছে। তিনি যদি প্রকৃত অপরাধী হয়ে থাকে তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সব ধরনের সহযোগিতা করবো।”
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে শৈলকূপা থানা ও ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সহ সভাপতি নজরুল জোয়ার্দার বলেন, “ছেলেটাকে নিয়ে রাহাতন নেছা স্কুলে গিয়েছিলাম, তার বাপ হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে সুযোগ চাওয়ায়, তাকে শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। গতকালের ঘটনা জানি না, সে যদি এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় তাহলে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এমন কাজ করে পার পাওয়া সম্ভব না। সে যার অনুসারীর হোক অপরাধের শাস্তি পেতে হবে।”
জানতে চাইলে ইবি থানার সাব ইনস্পেকটর (এসআই) শ্রীবাস কুন্ডু জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ঘটনাটি জানানোর পর রাতে সন্দেহজনক ব্যক্তির বাড়িতে অভিযান চালিয়েছি। সে বর্তমান পলাতক। ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে এজাহার ভুক্ত করে নেওয়া যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে থানার সহযোগিতা
ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, “আজকে বিকালে আসার কথা, ভুক্তভোগী যখন আসবে তখনই মামলার এজাহার ভুক্ত করে নিব। অভিযুক্তকে সনাক্ত করা গেছে। যেকোনো সময় গ্রেফতার করা হতে পারে।”
থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বরাত ভুক্তভোগীকে থানায় ডাকা হয়েছে। শিগগির এজাহার দায়ের করবেন ভুক্তভোগী। এদিকে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলেও প্রক্টর বিকাল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন। পরে প্রক্টর বরাত ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, ইবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব মাসুদ রুমী মিথুনের সঙ্গে শনিবার মামলা করতে আসবেন। জানতে চাইলে ভুক্তভোগী বলেন, “যাওয়ার বিষয়ে মামার (মিথুন) কাছ থেকে পরামর্শ নিলে ওনি না করে দেয়, শনিবারে নিয়ে যাব বলছে।” মিথুনের দাবি— “আমার এলাকার ভাগ্নে হয়, আজকে যাওয়ার সময় আমাকে ডাকছিল, আমি ব্যস্ত থাকায় শনিবার নিয়ে যাব।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (রুটিন ভিসি) অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী বলেন, “ঘটনাটি নজরে আসার পরপরই তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। পুনরায় অভিযুক্ত সনাক্তকরণে থানার সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী মেয়েটা এখন পর্যন্ত থানায় অভিযোগ দায়ের করেননি। সকালে অভিযোগ দিলে এতক্ষণে অভিযুক্ত আটক হতো। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বদ্ধপরিকর।”

স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে পলাতক অভিযুক্ত ব্যক্তি
এর আগে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী প্রক্টর বরাবর অভিযোগ করেন। অভিযোগ পত্রে ভুক্তভোগী লিখেন, ১ জুলাই বেলা ১১ ঘটিকা হতে ১১ টা ১৫ মিনিটের মধ্যে কলা অনুষদের ৫ম তলায় ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগের বাড়িডোরে তার সাথে আপত্তিকর ও যৌন হয়রানির মতো একটি ঘটনা ঘটে। উক্ত লোকটিকে সে ইতোপূর্বে দেখেননি এবং ঘটনাটি তাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত বিব্রত ও আতঙ্কিত করেছে। ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আলীনূর রহমানকে আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহা. খাইরুল ইসলাম ও ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. ওবায়দুল ইসলামকে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
মো. মিনহাজুর রহমান মাহিম
আপনার মতামত লিখুন