সালথায় দুই ‘মোড়ল’ দ্বন্দ্বে জিম্মি জনপদ হামলা–ভাঙচুর–অগ্নিসংযোগে আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান জানান, দুই পক্ষের বিরোধের জেরে এলাকায় একাধিক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় দুই গ্রাম্য মোড়লের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধ রূপ নিয়েছে ভয়াবহ সহিংসতায়। পাল্টাপাল্টি হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে সাধারণ মানুষ হয়ে পড়েছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। সর্বশেষ সোমবার (৪ মে) সকালে মিরের গট্টি গ্রামে হামলা চালিয়ে অন্তত ২০–২৫টি বসতবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গট্টি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দী গ্রামের ইউপি সদস্য নুরু মাতুব্বর ও বালিয়া গট্টি গ্রামের জাহিদ মাতুব্বরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এলাকায় তারা দুই প্রভাবশালী মোড়ল হিসেবে পরিচিত। একসময় উভয়েই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তারা বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর থেকেই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের মাত্রা বেড়ে যায়।
গত কয়েক মাসে অন্তত ১০টিরও বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এসব ঘটনায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
সহিংসতার সময় দুই শতাধিক বসতবাড়ি ভাঙচুর এবং কয়েকটি ঘরে অগ্নিসংযোগের অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, সর্বশেষ উত্তেজনার সূত্রপাত হয় রবিবার দুপুরে। নুরু মাতুব্বরের সমর্থক আনোয়ার শেখকে জাহিদের সমর্থকরা মারধর করলে পাল্টা হিসেবে জাহিদের পক্ষের রেজাউলকে হামলা করা হয়। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার সকালে মিরের গট্টি এলাকায় নুরু মাতুব্বরের ছেলে রাজিব মাতুব্বরকে কুপিয়ে আহত করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পরে নুরু সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জাহিদ সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক ও চাকরিজীবী অভিযোগ করেন, গট্টি, বালিয়া, আড়ুয়াকান্দী, মিরের গট্টি ও কানৈড় গ্রামের সাধারণ মানুষকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছেন এই দুই মোড়ল। তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলে এলাকায় বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়ে। চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও দখলদারিত্বের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
তারা আরও বলেন, একের পর এক সহিংসতা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি চোখে পড়ছে না। মামলা হলেও অনেক সময় আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয় না, ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
অভিযোগ অস্বীকার করে নুরু মাতুব্বর বলেন, প্রতিপক্ষের হামলায় তাদের অন্তত ১০–১২ জন সমর্থক গুরুতর আহত ও পঙ্গু হয়েছেন। থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ তা গ্রহণে গড়িমসি করছে বলেও দাবি করেন তিনি। অপরদিকে জাহিদ মাতুব্বর দাবি করেন, তিনি এখন আর কোনো রাজনীতি বা বিরোধে জড়িত নন এবং পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে চান।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান জানান, দুই পক্ষের বিরোধের জেরে এলাকায় একাধিক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. দবির উদ্দীন বলেন, সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন কাজ করছে এবং কোনোভাবেই অশান্তি সৃষ্টিকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।
আপনার মতামত লিখুন