ইবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় পবিত্র ঈদুল আজহা: ত্যাগ ও তাকওয়া পরীক্ষা
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম জাতির জীবনে এক অনন্য আধ্যাত্মিক মুহূর্ত। প্রতি বছর জিলহজ্বের দশম দিনে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমরা এই মহিমান্বিত দিনটি পালন করেন। কেবল পশু জবাইয়ের মধ্যে এই উৎসবের সীমানা আটকে নেই; এর গভীরে লুকিয়ে আছে মনের ভেতরের অহমিকা, লালসা ও সংকীর্ণতাকে বিসর্জন দেওয়ার এক চিরন্তন দর্শন। সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টিতে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করার যে শিক্ষা ঈদুল আজহা বহন করে, তা মানবজীবনকে করে তোলে আরও পরিশুদ্ধ ও অর্থবহ। এই উপলব্ধির আলোকেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীদের অনুভূতি তুলে ধরেছেন রুকনুজ্জামান হুমাঈদী।
ঈদুল আজহার অন্তর্নিহিত চেতনা
লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাত সুলতানা বলেন, ঈদুল আযহা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি মূলত আত্মত্যাগ, সমর্পণ এবং গভীর জীবনবোধের এক মহান শিক্ষা। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করার যে মূল চেতনা এই ঈদে রয়েছে, তা আমাদের ব্যক্তিজীবনের লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতা বিসর্জন দিতে উদ্বুদ্ধ করে। নিজের ভেতরের পশুবৃত্তিকে পরিহার করে একজন শুদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠাই কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য। কুরবানির আসল আনন্দ ও সার্থকতা নিহিত রয়েছে ভাগাভাগির মধ্যে। আমাদের চারপাশের অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমেই এই উৎসব পূর্ণতা পায়।
ত্যাগ, তাকওয়া ও মানবতার মহিমা
সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজা রহমান বলেন, কুরবানির ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, যা ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীক। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর অবিচল আনুগত্য ও মহান ত্যাগের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে উদযাপিত এই ঈদ আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের শিক্ষা প্রদান করে। বর্তমান সমাজে বৈষম্য ও দারিদ্র্যের বাস্তবতায় কুরবানির ঈদের প্রকৃত চেতনা তখনই পরিপূর্ণতা লাভ করে, যখন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখেও আনন্দের হাসি ফুটে ওঠে। সমাজের প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তি যদি দুস্থ ও ঘরহীন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তবে ঈদের আনন্দ সত্যিকার অর্থেই সর্বজনীন হয়ে উঠবে এবং একটি সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে উঠবে।
ত্যাগের মহিমায় কুরবানির ঈদ
ল’ এন্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিব আবদুল্লাহ বলেন, ঈদের আনন্দের সংজ্ঞা হলো পরিবারের সাথে পশুর হাটে যাওয়া আর ঈদের সালাত আদায়ের পর সকলের সাথে কুশল বিনিময় করা। তবে বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং কর্মচাপে অনেকের পক্ষেই পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অপরদিকে, আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের মাধ্যমে ঈদুল আজহা আনন্দ নিয়ে আসে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, মানুষের উচিত নিজের পশুত্বকে কুরবানি করে ঈদের আনন্দ সকলের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হওয়া উচিত সকলের একমাত্র উদ্দেশ্য।
‘কুরবানি’ গোশত ভক্ষণ নয়, উৎসর্গের ইবাদত
ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী বখতিয়ার মোহাম্মদ সোহান বলেন, কুরবানি অর্থ হলো ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি এবং বরকত লাভ করা। ঈদ শুধু জবাই করা পশুর গোশত ভক্ষণ করাই প্রধান উদ্দেশ্য নয়, বরং কুরবানি আমাদের একটি সুন্দর বার্তা দিয়ে থাকে। তা হচ্ছে, নিজের খুব কাছের আর প্রিয় জিনিসকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করে দেওয়া। তাই এই ঈদে আমাদের মন থেকে সেই কালো ইচ্ছাগুলো নিঃশেষ হওয়াই কাম্য। আমাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হওয়া দরকার এবং কুরবানি সেই সুস্পষ্ট ত্যাগের মহিমাকে বরাবরের ন্যায় আমাদের হৃদয়কে নতুনভাবে আলোড়িত করে।
ঈদের আনন্দ ও আমাদের দায়িত্বশীলতা
ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইমরান হোসেন সৈকত বলেন, ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত আনন্দময়, ভালোবাসায় ভরা এবং হৃদয়ের গভীর অনুভূতির একটি বিশেষ দিন। এই আনন্দকে কাছে পেতে মানুষ শত ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর হাজারো বাধা পেরিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে পরিবারের কাছে ছুটে আসে। ঈদুল আজহা শুধু আনন্দের উৎসবই নয়, এটি ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য শিক্ষা। এই দিনে আমরা হালাল পশু কোরবানি করি এবং সেই কোরবানির মাংস গরিব ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করি। এর মাধ্যমে আমরা শুধু আনন্দ ভাগাভাগিই করি না, বরং মানবতা ও সহানুভূতির এক সুন্দর দৃষ্টান্তও স্থাপন করি।
এক অন্যরকম অনুভূতির মুহূর্ত
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুম আহমেদ বলেন, প্রতিবছর ঈদুল আজহা মানেই যারা পড়াশোনা বা অন্য কোনো কারণে বাড়ি থেকে দূরে থাকেন তাদের কাছে এক নতুন উন্মাদনা। ছুটি পাওয়ামাত্রই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা শুরু। পরিবার-পরিজনের সাথে পশুর হাটে যাওয়া, এ যেন এক অন্যরকম অনুভূতি। চারপাশের ধুলোবালি, কাদা, ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহল আর অসংখ্য গরুর ডাক মিলে হাটে সৃষ্টি হয় এক অনন্য পরিবেশ। ঈদুল আজহা ত্যাগ, আত্মসংযম ও মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক অনন্য শিক্ষা দেয়। কোরবানির মাধ্যমে ধনী-গরিবের মাঝে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়।
ত্যাগ, সংযম ও তাকওয়ার মহিমান্বিত শিক্ষা
আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ মুহা. হুমায়ুন বলেন, ঈদুল আজহা আমার কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ ও ত্যাগের এক গভীর অনুভূতির নাম। প্রতি বছর কুরবানির ঈদ আমাদের জীবনে ফিরে আসে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটিকে ত্যাগ করার অনন্য শিক্ষা নিয়ে। এই ঈদ মূলত মানুষকে নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা দেয়। আজকের সমাজে আমরা অনেক সময় কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে বাহ্যিক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি, কে বড় পশু কিনলো, কার আয়োজন বেশি জাঁকজমকপূর্ণ। অথচ কুরবানির আসল শিক্ষা হলো বিনয়, সংযম ও আন্তরিকতা।
আপনার মতামত লিখুন