আজ শাপলা চত্বর গণহত্যা দিবস
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদ, এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ তৎকালীন প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ। ছবি: সংগৃহীত
২০১৩ সালের সেই নিঝুম রাত। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ২টা বেজে ৩০ মিনিট। হঠাৎ বিদ্যুৎহীন নিস্তব্ধ মতিঝিলের আকাশ চিরে জ্বলে ওঠে সার্চলাইট আর সাউন্ড গ্রেনেডের তীব্র আলো। শুরু হয় ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও ৫ মে’র সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হিসেবে অমলিন।
২০১৩ সালের শুরুতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের কয়েকজন ব্লগারের মাধ্যমে ইসলাম ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদে গর্জে ওঠে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। ১৩ দফা দাবিতে তৎকালীন আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর আহ্বানে ৫ মে রাজধানী অবরোধ করে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ। দিনভর সংঘর্ষের পর সন্ধ্যায় শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন কয়েক লাখ আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষ।
গভীর রাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে বাণিজ্যিক এলাকা। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর ভাষ্যমতে, সেই রাতে অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছিলেন। সে সময় তথ্যের প্রবাহ রুখতে দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা আজ অবধি এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দীর্ঘ ১২ বছরের বিচারহীনতার অচলায়তন ভেঙে দিয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের তথ্যমতে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৫৭ জনের শাহাদাত বরণের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন এবং নারায়ণগঞ্জে ২০ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলমান। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদ, এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ তৎকালীন প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ।
আজ ৫ মে উপলক্ষে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শোক ও প্রতিবাদের আবহ বিরাজ করছে। হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন সংগঠন দিনটি পালনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে: বিকেলে মতিঝিল শাপলা চত্বরে বিশাল প্রতিবাদী মানববন্ধন। সকালে নিহতদের স্মরণে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি।
এক যুগ আগে যারা স্বজন হারিয়েছিলেন, আজ তারা ট্রাইব্যুনালের বারান্দায় ন্যায়বিচারের আশায় দাঁড়িয়ে। ইতিহাসের সেই দীর্ঘশ্বাসের বিচার হবে—এমনটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
আপনার মতামত লিখুন