বিশেষ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন
পেশায় সাংবাদিকতা, নেশা যেন না হয় ‘সাংঘাতিক’
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভের কারিগর যারা, সেই সাংবাদিকদের জীবন ও জীবিকা আজ এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্তার এবং 'রিয়েল টাইম' নিউজের যুগে সাংবাদিকতা এখন আর কেবল একটি পেশা নয়, এটি অনেকের কাছে এক ঘোরলাগা নেশায় পরিণত হয়েছে। তবে সংবাদের প্রতি এই প্রবল আসক্তি যখন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন সেই নেশাকে ‘সাংঘাতিক’ বলে অভিহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান সময়ে 'সবার আগে সংবাদ' দেওয়ার একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন পোর্টালগুলোর এই প্রবল চাপে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য যুদ্ধের মধ্যে থাকেন। একটি সংবাদের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক সময় তারা ভুলে যান নিজের জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলো। সারাক্ষণ স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন, ইমেইল এবং সোর্সের কলের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলো ধীরে ধীরে এক যান্ত্রিক নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সাংবাদিকতা একটি উচ্চ-চাপযুক্ত (High-stress) পেশা। যখন এই পেশার প্রতি আবেগ বা প্যাশন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটি ব্যক্তির ব্যক্তিগত সত্তাকে গ্রাস করে ফেলে। ফলে কাজ ও জীবনের মধ্যে যে সূক্ষ্ম দেয়াল থাকা প্রয়োজন, তা ভেঙে পড়ে।
সংবাদকর্মীদের এই অতি-উৎসাহী নেশা বেশ কিছু গুরুতর সমস্যার জন্ম দিচ্ছে:
- পেশাদারিত্ব বনাম আসক্তি: সাংবাদিকতায় সাহসিকতা অপরিহার্য, কিন্তু রোমাঞ্চের নেশায় পড়ে অনেক সময় সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন যেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে না। একে সাহসিকতা নয়, বরং এক ধরনের 'সাংঘাতিক' প্রবণতা হিসেবে দেখছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা।
- মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয়: প্রতিনিয়ত যুদ্ধ, মৃত্যু, দুর্ঘটনা ও দুর্নীতির সংবাদ সংগ্রহ করতে করতে সংবাদকর্মীরা অজান্তেই ট্রমার শিকার হন। এই মানসিক চাপ যখন তারা নেশার ঘোরে উপেক্ষা করেন, তখন তা দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা বা 'বার্নআউট'-এ রূপ নেয়।
- পারিবারিক ও সামাজিক বিচ্ছেদ: সংবাদের পেছনে ২৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে গিয়ে সাংবাদিকরা তাদের পরিবারকে গুণগত সময় দিতে পারছেন না। ফলে বাড়ছে ব্যক্তিগত কলহ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
- নৈতিক স্খলন: জনপ্রিয়তার নেশা বা 'ভাইরাল' হওয়ার প্রবণতা অনেক সময় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দ্রুত খবর দেওয়ার নেশায় তথ্যের সত্যতা যাচাই না করা একটি সাংঘাতিক অপেশাদারিত্ব।
দেশের প্রথিতযশা সংবাদিকদের মতে, সাংবাদিকতা হলো একটি ম্যারাথন দৌড়ের মতো, এখানে ১০০ মিটারের স্প্রিন্ট খেললে দ্রুত হাঁপিয়ে উঠতে হয়। তাদের মতে, "একজন সাংবাদিক তখনই সেরা কাজ দিতে পারেন যখন তিনি নিজে সুস্থ থাকেন। নেশা থাকা ভালো, কিন্তু সেই নেশা যদি বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তবে সাংবাদিকতা আর জনকল্যাণমূলক থাকে না।"
বিশেষজ্ঞরা সাংবাদিকতায় ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন:
- পেশাদার দূরত্ব (Professional Detachment): সংবাদের বিষয়ের সাথে আবেগগতভাবে জড়িয়ে না পড়ে নির্মোহভাবে তথ্য উপস্থাপন করা।
- সময় নির্ধারণ: কাজের নির্দিষ্ট সময় শেষে নিজেকে সংবাদ জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যক্তিগত শখ বা পরিবারে সময় দেওয়া।
- নিরাপত্তা ও নীতি: সংবাদের চেয়ে জীবন বড়—এই সত্যটি সর্বদা মনে রাখা।
সাংবাদিকতা একটি মহান ব্রত। এই পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে সাংবাদিকদের নিজের প্রতিও যত্নশীল হতে হবে। নেশা থাকতে হবে তথ্যের স্বচ্ছতা আর সত্য উদঘাটনে, কিন্তু সেই নেশা যেন ব্যক্তি বা সমাজকে কোনো সাংঘাতিক বিপদের মুখে না ঠেলে দেয়। সুস্থ সাংবাদিকতাই পারে একটি সুন্দর ও সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে।
তথ্য সংগ্রহের এই লড়াইয়ে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে, বরং নিজের মেধা ও সৃজনশীলতাকে সঠিক পথে পরিচালনা করাই হোক আধুনিক সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র। নেশা হোক সৃজনশীল, সাংঘাতিক নয়।
আপনার মতামত লিখুন