ঠাকুরগাঁওয়ে ভূল্লী বাঁধে নির্মিত হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য ‘‘গাড়িয়াল’’
‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, কত রব আমি পন্থের পানে চাঁইয়া রে’-গ্রামবাংলার প্রাণপ্রিয় এই গান যেমন এখন আর শোনা যায় না, তেমনি এক সময়ের জনপ্রিয় বাহন গরু ও মহিষের গাড়িও এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী যান ও এর সঙ্গে জড়িত গাড়িয়াল পেশা। বর্তমানে শহর তো দূরের কথা গ্রামাঞ্চলেও এখন গরুর গাড়ির দেখা পাওয়াটা বড়ই দুষ্কর। ঠাকুরগাঁওয়ে ভূল্লী বাঁধে নদীর কলতান আর স্নিগ্ধ বাতাসের মাঝে ফুটে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলার অনন্য প্রতিচ্ছবি দৃষ্টিনন্দন "গাড়িয়াল" ভাস্কর্য।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভূল্লী থানার মিনি কক্সবাজার খ্যাত বালিয়া ইউনিয়নের ভূল্লী বাঁধে সেচ প্রকল্প এলাকায় সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিশেষ এক ভাস্কর্য— যার নাম দেওয়া হয়েছে "গাড়িয়াল"।
এক সময় গরু ও মহিষের গাড়ির ছিল ব্যাপক প্রচলন। বিয়ে, উৎসব কিংবা কৃষিপণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই এই বাহন ছিল অপরিহার্য। গ্রামবাংলার মানুষের প্রধান যাতায়াত ও মালবহনের মাধ্যম ছিল দুই চাকার গরু ও মহিষের গাড়ি। বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনে একমাত্র ভরসা ছিল এই গাড়িয়াল।
যুগের পরিবর্তন ও আধুনিক যান্ত্রিক যানবাহনের আগ্রাসনে আজ সেই চিরচেনা দৃশ্য প্রায় বিলুপ্ত। 
গ্রাম বাংলার এগিয়ে যাওয়ার এই অবয়ব কেবল একটি নিথর মূর্তি নয়; বরং এটি এই অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক। ঠাকুরগাঁওয়ের এই জনপদে গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি এখানকার লোকজ ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই জীবনবোধকে কালজয়ী রূপ দিতেই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রশাসন এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, "গাড়িয়াল" ভাস্কর্যটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা। শৈল্পিক কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলা এই ভাস্কর্যটি ইতিমধ্যে পথচারী ও স্থানীয়দের নজর কেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিজেদের সংস্কৃতিকে এমন শৈল্পিক উপায়ে উপস্থাপিত হতে দেখে তারা অত্যন্ত আনন্দিত।
ভূল্লী এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, "আমাদের বাপ-দাদারা এভাবেই গরুর গাড়ী মহিষের গাড়ী করে বিভিন্ন কাজ করতেন। এই মূর্তিটি দেখলে মনে হয় আমাদের জীবনের গল্পই কেউ পাথরে খোদাই করে রেখেছে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি ও মানুষের সাথে গ্রাম বাংলার বিভিন্ন সংস্কৃতি মিশে আছে। আমরা চেয়েছি আমাদের উত্তরসূরিরা যেন তাদের শেকড়কে ভুলে না যায়। 'গাড়িয়াল' ভাস্কর্যটি মূলত গ্রাম বাংলার প্রতীক। এটি একদিকে যেমন আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে ভূল্লী বাঁধ সেচ প্রকল্প এলাকাকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
তিনি আরও বলেন, ভূল্লী বাঁধ সেচ প্রকল্প এলাকাটি আগে থেকেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এখন এই শিল্পকর্মটি যুক্ত হওয়ায় এলাকার নান্দনিকতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমরা আশা করছি, খুব শীঘ্রই এটি জেলার অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মামুনুর রশিদ মামুন
আপনার মতামত লিখুন