বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
'উপকূলীয় অক্সফোর্ড' খ্যাত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) দেশের পঞ্চম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২৭তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০০৬ সালের ২২ জুন যাত্রা শুরু করে। মাত্র ৪টি বিভাগ, ১৩ জন শিক্ষক এবং ১৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। আগামীকাল ২২ জুন দুই দশক পূর্ণ করে ২১তম বছরে পদার্পণ করবে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
নানা চড়াই-উতরাই, সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০ বছর পূর্ণ করে ২১তম বছরে পদার্পণ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ বিশেষ মুহূর্তে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
তবে অর্জনের এই দুই দশকের যাত্রায় কিছু অপূর্ণতার কথাও সামনে এসেছে। আবাসন সংকট, পর্যাপ্ত ক্লাসরুম ও ল্যাব সুবিধার অভাব, আধুনিক টিএসসি, মুক্তমঞ্চ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো এখনও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ বছর পূর্তি ও ২১তম বছরে পদার্পণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে শিক্ষার্থীরা একটি আরও আধুনিক, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক নোবিপ্রবির প্রত্যাশা করছেন।বিশ্ববিদ্যালয় দিবসকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেছেন তাদের অনুভূতি, প্রত্যাশা ও ভাবনার কথা-
২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী পারভেজ খান বলেন, "২০তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস আমাদের জন্য গর্ব ও আনন্দের একটি বিশেষ উপলক্ষ। এ দিনে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমার কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলের খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন খাবার শিক্ষার্থীদের সুস্থ জীবন ও শিক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার পরিবেশ, খাবারের মান ও সেবার উন্নয়ন প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা একটি স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে সময় কাটাতে পারে।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলমান একাডেমিক ভবন-৩-এর নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। এর ফলে শ্রেণিকক্ষ সংকট অনেকাংশে দূর হবে এবং শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে একটি আধুনিক টিএসসি প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। একটি পূর্ণাঙ্গ টিএসসি শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সর্বোপরি, আমি আশা করি উপাচার্য শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীকল্যাণের ক্ষেত্রে আরও সমৃদ্ধ ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবেন।"
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আমিনুর রহমান রাতুল বলেন, "দূর সীমানার সাতক্ষীরা থেকে প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যখন 'উপকূলীয় অক্সফোর্ড' খ্যাত নোবিপ্রবির ১০১ একরের সবুজ চত্বরে এসেছিলাম, তখন থেকেই এই ক্যাম্পাস আমার স্বপ্ন ও অস্তিত্বের অংশ। আজ দুই দশক পেরিয়ে প্রিয় বিদ্যাপীঠ যখন ২১তম বছরে পদার্পণ করছে, তখন বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এখানকার শান্তিনিকেতন, নীল দিঘি আর চিরচেনা 'লাল বাস'—সবকিছুই আমার গর্ব ও স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল।
তবে এই শুভক্ষণে প্রাপ্তির আনন্দের পাশাপাশি কিছু অপ্রাপ্তির বেদনাও আমাদের ছুঁয়ে যায়। দুই দশক পার করেও তীব্র আবাসন সংকট, আমাদের বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের ক্লাসরুমের অভাব, অপর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা এবং একটি টিএসসি ও মুক্তমঞ্চের অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশকে মন্থর করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা—সব সীমাবদ্ধতার মেঘ কেটে যাক। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আমাদের প্রাণের বিদ্যাপীঠ সাহিত্য, জ্ঞান ও গবেষণায় বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক এবং প্রতিটি নোবিপ্রবিয়ান হয়ে উঠুক আগামীর এক একটি আলোকবর্তিকা।"
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হুমায়রা আফিফা বলেন,
"বগুড়া থেকে এত দূরে এসে ১০১ একরের সবুজে ঘেরা নোবিপ্রবি আজ আমার দ্বিতীয় ঠিকানা হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় ভরা এই প্রাঙ্গণে যেন বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে লেখা গানের ওই লাইনের মতো—'এইখান থেকে রঙ নিয়ে প্রজাপতি সেজেছি'।
শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ে নোবিপ্রবি আমাকে নতুন স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়টিকে করেছে প্রাণবন্ত ও অনন্য। মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা এখান থেকেই পেয়েছি। ২০তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে প্রিয় নোবিপ্রবির জন্য রইল অফুরন্ত ভালোবাসা, গর্ব এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের শুভকামনা।"
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হাফসা কবির ঐশী বলেন, "দীর্ঘ তিন বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। শুরু থেকেই ক্যাম্পাস আমার কাছে ভালোবাসা ও স্বপ্নের একটি স্থান। এখানে আমি অনেক সুন্দর স্মৃতি অর্জন করেছি এবং নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ পেয়েছি।
তবে কিছু সমস্যাও রয়েছে, যেগুলোর সমাধান হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ক্যাম্পাসজীবন আরও সমৃদ্ধ হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আবাসন সংকট। পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিক্ষার্থীর ভোগান্তি কমবে। এছাড়া ক্যাম্পাসে পানির সমস্যা দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, আমি যে বিভাগে অধ্যয়ন করি সেখানে ক্লাসরুম সংকট রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা দেখা দেয়, যা পাঠদান কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। এ সমস্যারও কার্যকর সমাধান আশা করি।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে আমার প্রত্যাশা—আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসটি যেন শিক্ষার্থীবান্ধব, আধুনিক ও সকল সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি আদর্শ শিক্ষাঙ্গনে পরিণত হয়।"
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী এমরান হোসেন বলেন, "দুই দশকের পথচলায় প্রাণের বিদ্যাপীঠ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের বিভিন্ন খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতোমধ্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বিকাশের এক প্রাণকেন্দ্র।
তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছু প্রত্যাশাও রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আবাসন সংকট, পর্যাপ্ত ল্যাব ও ক্লাসরুমের অভাব শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া যানবাহন সংকট এবং আবাসিক-অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—এসব সমস্যান করে শতভাগ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক এবং নোবিপ্রবি শিক্ষা ও গবেষণায় আরও সমৃদ্ধ হয়ে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।"
২১তম বছরে পদার্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্তে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা—আগামী দিনে নোবিপ্রবি দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণার বিকাশে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এবং মেধাবী, উদ্ভাবনী ও স্মার্ট প্রজন্ম গঠনে অনন্য ও নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করবে।
আপনার মতামত লিখুন