কুবির ছাত্রদল কর্মীরা গেলেন কর্মচারীর জমি দখল করতে
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ছাত্রদল কর্মীদের দিয়ে জোরপূর্বক এক কর্মচারীর জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই আওয়ামীপন্থী শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী কর্মচারীর নাম কর্মচারী জহিরুল ইসলাম।
অভিযুক্তরা হলেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি.এম মনিরুজ্জামন, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল হায়াত, মালী কামাল ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী হাসান ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীর নামে এ অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। দুজন শিক্ষকের মধ্যে জি এম মনিরুজ্জামান আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন এবং আবুল হায়াত বঙ্গবন্ধু পরিষদ থেকে আওয়ামী সরকার আমলে কুবি শিক্ষক সমিতিতে যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন৷
যেসব শিক্ষার্থীদের নামে অভিযোগ করেছেন তাদের সবাই ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে জানা যায়।
জমি দখল ও ভুক্তভোগীকে হুমকি ধমকি সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ প্রতিবেদকে হাতে এসেছে।
প্রতিবেদকের হাতে আসা ভিডিওতে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ৮ জন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন—বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল মালেক আকাশ, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুদ, একই বর্ষের আইন বিভাগের আজহারুল ইসলাম ইমরান, ইংরেজি বিভাগের জহিরুল ইসলাম জয়, লোকপ্রশাসন বিভাগের সাইফুল ইসলাম রাসেল, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সৌরভ কাব্য এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী খান মোহাম্মদ নাঈম।
শাখা ছাত্রদলের একটি সূত্র জানায়, সাইফুল মালেক আকাশ, জহিরুল ইসলাম জয়, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুদ ও খান মোহাম্মদ নাঈম এ ঘটনার নেতৃত্ব দেন। তবে তারা সবাই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এই বিষয় নিয়ে গত ৫ মে (মঙ্গলবার) জহিরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
প্রতিবেদকে হাতে আসা নথিপত্র বলছে জহিরুল ইসলাম কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ১ নং বিজয়পুর লালমাই পাহাড়ের ধনমোড়া এলাকায় মোছলেম মিয়ার কাছ থেকে ২০১৯ সালে ৩০ শতক ভূমি ক্রয় করেন (যার আর.এস খতিয়ান নং- ৯৩৪ ও বি.এস খতিয়ান নং- ১২৭২, সাবেক দাগ নং- ৫৫৪৩ ও হাল বি.এস দাগ নং- ১১৪৯৫)। একই পাহাড়ে পাশাপাশি হালিমা নামের এক নারীর কাছ থেকে ৩০ শতক জমি ক্রয় করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি.এম মনিরুজ্জামান ও ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল হায়াত। এই জায়গার পূর্বের মালিক ছিলেন মো. আবদুল মোতালেব ও আবদুল গফুর। এর মধ্যে আবদুল মোতালেবের অংশ ১০ শতক আর আবদুল গফুরের অংশ রয়েছে ২০ শতক (যার বি.এস খতিয়ান নং- ১২৭২, সাবেক দাগ নং- ৫৫৪৩ ও হাল বি.এস দাগ নং- ১১৪৯৬)। তবে জি.এম মনিরুজ্জামান ও আবুল হায়াত সংশোধিত দলিল মূলে আবদুল গফুরের ১১৪৯৫ দাগের ২০ (বিশ) শতক ভূমির মালিক হন।
ভুক্তভোগী জহিরুল ইসলাম বলেন, "গত ২ মে সকাল ১১টার দিকে ধনমোড়া পাহাড়ে গিয়ে আমার জায়গা দখল করেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি.এম মনিরুজ্জামান ও ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল হায়াত। তাদের সাথে ছিলেন মালী কামাল হোসেন এবং কুবি শাখা ছাত্রদলের ৯ জন কর্মী।" অভিযোগ অনুযায়ী, এই দখল কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নির্দেশেই পরিচালিত হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জমি দখলের প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
জহিরুল ইসলাম জানান, "ওখানে যাওয়া শিক্ষার্থীরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলে, 'এই খুঁটিগুলো তুললে তোর হাত ভেঙে ফেলব। আমরা যেটা করেছি সেটাই রাইট (সঠিক)। থানায় মামলা করিস, সবাই আমাদেরকে চিনে।' স্যারেরাও একই কথা বলেছেন।"
তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত পক্ষ তার জমির পূর্ব পাশে বিভিন্ন দাগ ও খতিয়ানের আওতায় পৃথকভাবে জমি ক্রয় করলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার নিজস্ব জমি অবৈধভাবে দখল করেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি. এম মনিরুজ্জামান বলেন, "আমাদের জমিগুলো পাশাপাশি। আমরা তাকে বলেছি—তুমি যার থেকে জমি কিনেছ তাকে ডাকো এবং একজন আমিন (ভূমি পরিমাপক) ডাকো; আমরাও আমাদের জমির পূর্বের মালিক ও আমিন ডাকব। তখন আলোচনার মাধ্যমে এটা সমাধান করা যাবে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট একটা চাকরি করে, সে ভুল করতেই পারে। কিন্তু সে আমাদের সাথে তখন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে।"
বিরোধপূর্ণ জমিটি যেহেতু শিক্ষক ও কর্মচারীর এবং বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা যেত, সেখানে কেন শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া হলো এবং তারা কেন হুমকি দিল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমরা কাউকে সাথে করে নিয়ে যাইনি। তারা হয়তো নতুন ক্যাম্পাস দেখতে গিয়েছিল। ফেরার সময় শিক্ষকদের সাথে কর্মচারীর বাকবিতণ্ডা দেখে সেখানে এগিয়ে আসে। তবে তারা কোনো হুমকি দেয়নি। আমরা অবশ্যই আইনের মাধ্যমেই এটা সমাধান করতে চেয়েছি, কিন্তু সে মানেনি। আমরা এখনো চাচ্ছি এটি আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা হয়ে যাক। আমরা সবাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করি, একই পরিবারের অংশ।"
একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক মো. আবুল হায়াত। তিনি বলেন, "এই জমিটা আমরা তিনজন ২০১৯ সালে কিনেছি। সে তিন-চার মাস আগে এসে বলতেছে সে জায়গায় রাস্তা বেশি পাবে। ইন দ্য মিন টাইম (এরই মধ্যে) সে আমাদের জায়গার গাছ কেটে ফেলেছে।"
শিক্ষার্থীদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, "শিক্ষার্থীরা ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা এসে জাস্ট (শুধু) তাকে জিজ্ঞেস করেছে যে সে কেন শিক্ষকদের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলছে।"
কিন্তু ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায় শিক্ষকরা তাদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে ছাত্রদল সূত্রে জানা যায়, "শিক্ষকদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় তারা আমাদেরকে বলেছে যে তারা একটি বিপদে পড়েছে। আমরা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো সমস্যায় যাই তাই এখানেও গিয়েছি। কাউকে কোনো হুমকি দেইনি বরং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী দেখে তাকে বলেছি, মামা আপনারা বসে আলোচনা করে এটা সমাধান করে ফেলেন এবং তিনিও আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। এখানে টাকা-পয়সার কোনো কথাই আসেনা। এটা ভিত্তিহীন।"
আরেক অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মাহমুদ মাসুদ বলে, "আমরা ঐদিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম, গিয়ে দেখি আমার ডিপার্টমেন্টের একজন স্যার আর ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন স্যার, এমনি তারা পূর্ব পরিচত তো তাদের সাথে কথা বললাম, এতোটুকুই। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কে অভিযোগ দিছে বা কার জায়গা জমি আমি জানি না কিছু। খুটি বসানোর মতো কোনো কিছু আমি দেখিনি। এমনিতে তারা কথা বলছিলো তা দেখে আমরা চলে আসি।"
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, “এ বিষয়ে আমি এখনো অবগত নই। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি যাচাই করা হবে। কেউ যদি ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের অপকর্মে জড়িত থাকে, তাহলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
আপনার মতামত লিখুন