ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, গভীর রাতে ভিডিও কল, চেম্বারে ডেকে কুপ্রস্তাব, বডি শেমিং এবং নম্বর কমিয়ে দেওয়ার হুমকিসহ গুরুতর অভিযোগ ওঠার এক বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। ফলে অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গত বছরের জুলাই মাসে বিভাগের ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের একাধিক নারী শিক্ষার্থী লিখিতভাবে বিভাগের সভাপতির কাছে অভিযোগ করেন। পরে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পৌঁছালে অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস আদেশ অনুযায়ী, কমিটিকে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত শিক্ষক গভীর রাতে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমোতে যোগাযোগের চেষ্টা করতেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতেন এবং সাড়া না পেলে বার্তা আনসেন্ট করে দিতেন। এছাড়া চেম্বারে ডেকে কুপ্রস্তাব দেওয়া, ক্লাসে নারী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করা, শারীরিক গঠন ও পোশাক নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা এবং তার কথামতো না চললে পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
এসব অভিযোগ সামনে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করে। একই সঙ্গে আল-ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ নাজিমুদ্দিনকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ বা প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
এদিকে দীর্ঘ সময়েও তদন্ত শেষ না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির মাধ্যমে দোষী প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শিক্ষার্থী বলেন,
“অভিযোগ দেওয়ার সময় আমরা ভেবেছিলাম দ্রুত তদন্ত শেষ হবে এবং একটি সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত ফলাফল জানতে পারিনি। এতে আমাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন,
“আমরা ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্যে অভিযোগ করিনি। নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্যই অভিযোগ করেছিলাম। দীর্ঘদিনেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় মনে হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘ হচ্ছে।”
বিভাগের শিক্ষার্থী সাদীয়া মাহমুদ মীম জানান, “ওনার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানার জন্য তদন্ত কমিটির আহ্বায়কের কাছে খোঁজ নিয়ে তেমন কিছু জানতে পারিনি। তবে তিনি বলেছেন, শারীরিকভাবে এবিউজের কোনো ঘটনা না ঘটায় স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে না।”
বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. আবু হেনা মোস্তফা বলেন, “ঘটনার বিষয়ে তদন্ত ও সিদ্ধান্ত সকল কিছুই প্রশাসনের হাতে। তবে রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্তের মেয়াদ ৬ মাস। আমরা চাই, দ্রুত কোনো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।”
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ নাজিমুদ্দিন বলেন, “আমরা কিছুদিন আগেই রিপোর্ট জমা দিয়েছি। জমা দানে সময় বিলম্বিত হওয়ার কারণ রিপোর্টে উল্লেখ করা আছে। বিষয়গুলো কনফিডেনশিয়াল হওয়ার কি ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বা অন্যান্য তথ্য দেওয়া যাচ্ছে না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল হক বলেন, “সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভার দিন রিপোর্ট জমা দেওয়ায় সেটি সিন্ডিকেটে ওঠেনি। পরের সিন্ডিকেটে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”