নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) চাকরির প্রলোভনে অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির দুটি আলোচিত ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত প্রতিবেদন। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, অন্যটি ব্যাংকের জাল সিল ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সনদ উত্তোলনের ফি আত্মসাতের ঘটনা।
জানা যায়, মো. আরাফাতুল ইসলাম নামের এক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মুগ্ধ মেডিকেল সেন্টারের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. ইসমত আরা পারভীনের (তানিয়া) বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়, চাকরিপ্রার্থী ও তার পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর জুলাই আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে তিনি প্রতিশ্রুত পদে নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হন। পরে ওই টাকা ফেরত দিতেও অস্বীকৃতি জানান তিনি।
এ ঘটনায় গত বছরের ২৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী আরাফাতুল ইসলাম। অভিযোগের সঙ্গে চাকরিপ্রার্থীর স্বজন ও অভিযুক্ত ডাঃ ইসমাত আরা পারভীন(তানিয়া) এর কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় গত বছরের ২৭ মে ডা. ইসমত আরা পারভীনের এমসিপিএস ডিগ্রির সনদ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গঠিত তদন্ত কমিটিকে। তিন সদস্যবিশিষ্ট ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তৎকালীন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ।
ডা. ইসমত আরা পারভীনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বে থাকা কমিটি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। এর মধ্যে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. হানিফ মুরাদ চলতি মাসের ৭ জুন লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। কমিটির আহ্বায়ক অন্যত্র যোগদান করায় তদন্তকাজের অগ্রগতি নিয়েও সৃষ্টি হয় ধোঁয়াশা।
অন্যদিকে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ‘কাম কম্পিউটার টাইপিস্ট’ মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইনের বিরুদ্ধে ব্যাংকের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে শিক্ষার্থীদের সনদ উত্তোলনের ফি আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ ওঠে।
জানা যায়, শাহাদাত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ব্যাংকে ফি জমা দেওয়ার কথা বলে নগদ অর্থ গ্রহণ করতেন। পরে তিনি ব্যাংকে টাকা জমা না দিয়ে নিজের কাছে রাখা নকল সিল ব্যবহার করে রসিদে ব্যাংকের সিল ও স্বাক্ষরের আদলে জাল সিল বসাতেন। ফলে শিক্ষার্থীরা অর্থ জমা হয়েছে বলে মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হতো না।
দীর্ঘদিন ধরে গোপনে চলা এ জালিয়াতি চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশ্যে আসে। ঘটনার তদন্তে রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটি গঠনের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
ডা. ইসমত আরা পারভীনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ বলেন, "তদন্তের সব কাজ শেষ। শুধু রিপোর্ট টাইপিংয়ের কাজটুকু বাকি আছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে আসায় সেটুকু বাকি রয়ে গেছে। প্রশাসন কমিটিটি রিভাইজ করে দিলে ফাইলে সবকিছুই আছে, তারা রিপোর্ট লিখে জমা দিলেই হবে।"
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের জালিয়াতির বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ সাইফুল আলম বলেন, "তদন্তের কাজ শেষ। দ্রুতই রিপোর্ট সাবমিট করবো।"
এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ তামজিদ হোসাইন চৌধুরী জানান, ডা. ইসমত আরা পারভীনের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনো পাননি। কমিটির আহ্বায়ক না থাকায় কমিটি রিভাইজ করা হবে বলেও জানান তিনি। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে সংঘটিত জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুতই এটি হাতে পাব।
দুটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ না দেখায় বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সচেতন মহল।