শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুদকে দুর্নীতির অভিযোগ

মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুদকে দুর্নীতির অভিযোগ

তিমির বনিক

মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ মনছুর আলমগীরের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি,অনিয়ম ও কলেজের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিনষ্টের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)-কে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। দুদকের হবিগঞ্জ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বরাবর এই অভিযোগপত্রটি জমা দেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সচেতন মহল।  

অভিযোগপত্রে অধ্যক্ষের পাশাপাশি কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ শরীফুর রহমান এবং রসায়ন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ রফি উদ্দিনের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।  

লিখিত অভিযোগে ১৬টি সুনির্দিষ্ট খাতে সরকারি তহবিল আত্মসাৎ ও অনিয়মের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান অভিযোগগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো:  

• ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনৈতিক কমিশন: 'Dynamic Host BD' নামক অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনুমোদনহীন অতিরিক্ত চার্জ আদায় করা হচ্ছে এবং উক্ত প্ল্যাটফর্ম থেকে অধ্যক্ষ অনৈতিকভাবে 'কমিশন' গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।  

• পরিবহন ও নির্মাণ খাতে অনিয়ম: শিক্ষার্থীদের জন্য ৩টি নতুন বাস ক্রয়ের অনুমোদন থাকলেও মাত্র ২টি জরাজীর্ণ পুরাতন ইঞ্জিনচালিত বাস কেনা হয়েছে, যা অল্প দিনেই বিকল হয়ে পড়ে। এছাড়া কলেজের প্রধান ফটকে অভিভাবক ছাউনি ও মুক্তমঞ্চ নির্মাণ প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে বহুগুণ অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।  

• লাইব্রেরি ও ক্ষুদ্র মেরামতে ভুয়া বিল: কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামান্য কাজ এবং কলেজের বিভিন্ন স্থানে নামমাত্র নিয়মিত ক্ষুদ্র মেরামতের অজুহাতে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ লোপাট করা হচ্ছে।  

• ক্রীড়া ও ইফতার তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ: ২০২৫ সালের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া তহবিলের অর্থ তোলা হলেও দীর্ঘ ৬ মাস ধরে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার দেওয়া হয়নি। অপরদিকে, ২০২৬ সালের বহিঃক্রীড়া অনুষ্ঠানটি জাতীয় নির্বাচনের দোহাই দিয়ে মাত্র ৩ ঘণ্টায় সম্পন্ন করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়াও ২০২৬ সালের রমজানে বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের ইফতার বাজেট জোরপূর্বক এবং স্বাক্ষর জালিয়াতি করে উত্তোলনসহ তিনটি ভিন্ন তহবিল থেকে শিক্ষক পরিষদের ইফতারের নামে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়।  

• আপ্যায়নে নজিরবিহীন বিলাসিতা: ২০২৫ সালের একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে প্রধান অতিথি করে তাঁর পরিবারসহ পাঁচ তারকা মানের 'হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান'-এ রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করে কলেজ তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় করা হয়েছে।  

• শোক দিবসে পিকনিক ও স্বজনপ্রীতি: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক চলাকালীন সময়ে অধ্যক্ষ ও তাঁর সহযোগীরা মৌলভীবাজারের 'রাঙ্গাউটি রিসোর্টে' শিক্ষক পরিষদের পিকনিকের আয়োজন করে রাষ্ট্রীয় শোকের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। এছাড়া বার্ষিক মিলাদ মাহফিলের খাবার বিধি বহির্ভূতভাবে অধ্যক্ষের পরিচিত 'কলাপাতা' রেস্তোরাঁ থেকে চড়া মূল্যে সরবরাহ করা হয়।  

• শিক্ষা সফর ও সেমিনারের টাকা লোপাট: ডিগ্রি (পাস) কোর্সের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফর এবং বাংলা বিভাগের সেমিনারের জন্য পুস্তক ক্রয়ের বরাদ্দকৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট তহবিল থেকে উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কোনো শিক্ষা সফর বা বই কেনা হয়নি।  

প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও চেইন অফ কমান্ড ধ্বংসের অভিযোগ:

অভিযোগপত্রে আরও জানানো হয়, সহযোগী অভিযুক্ত প্রফেসর মোঃ রফি উদ্দিন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করার পরও প্রতিদিন নিয়মিতভাবে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। তিনি উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের সাথে যোগসাজশ করে কলেজের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছেন। তাঁর সার্বক্ষণিক উপস্থিতির কারণে সাধারণ শিক্ষকরা অধ্যক্ষের সাথে স্বাভাবিক দাপ্তরিক যোগাযোগ করতে পারছেন না, যার নেতিবাচক প্রভাবে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি কমে গেছে এবং শিক্ষার সামগ্রিক মান ব্যাহত হচ্ছে।  

অভিযোগকারীদের দাবি, এই চক্রটি বর্তমানে তাদের অপকর্ম ঢাকতে আগামী জুন-জুলাইয়ের মধ্যে তড়িঘড়ি করে অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য ঢাকায় জোর তদবির চালাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে দুর্নীতি দমন কমিশনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন মৌলভীবাজারবাসী।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জে সমন্বিত দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে উপ-পরিচালক শোয়াইব আহমেদ জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। দ্রুততম সময়ে আমরা একটি প্রতিবেদন দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

প্রধান উপদেষ্টা : ইমাম হোসেন, নয়া সংবাদ মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ৩৩, তোপখানা রোড, রমনা, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত.

প্রিন্ট করুন