গোপালগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার চর মানিহার গুচ্ছ আদর্শ গ্রামে পরিচালিত এক মাঠপর্যায়ের গবেষণায় শিশুস্বাস্থ্যের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ৮ জন শিক্ষার্থীর একটি গবেষক দল ৮৫০টি পরিবারের মধ্যে ১৬টি পরিবারকে নমুনা হিসেবে নিয়ে এ মাঠকর্ম পরিচালনা করে।
গবেষক দলের সদস্যরা হলেন—মোঃ সবুজ মিয়া, আহনাফ হাসান রাতুল, আফিফা মাশকুরা, দীপান্বিতা বাদাগ্য, ঐশী মন্ডল, মিসৌরি হক, মোঃ আবু মুসা এবং আব্দুল্লাহ্ বিন মোঃ হোসেন।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতে দেখা গেছে, অপুষ্টি, বিশুদ্ধ পানির অভাব, স্যানিটেশন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রামের শিশুরা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বেড়ে উঠছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামটির অধিকাংশ শিশুর মধ্যে অপুষ্টি, সর্দি-কাশি, জ্বর, ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে। নিরাপদ পানির অভাব এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে এসব রোগের প্রকোপ আরও বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া অভিভাবক মোছা. হালিমা খাতুন বলেন, দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে অনেক পরিবারই শিশুদের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার দিতে পারে না। দুধ, ডিম, মাছ, মাংস ও ফলমূল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় না থাকায় শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, শারীরিক দুর্বলতা এবং ঘন ঘন অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. ফরিদা বেগম জানান, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে স্থানীয় ওষুধের দোকান বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সাধারণ রোগও জটিল আকার ধারণ করছে। তিনি নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবার দাবি জানান।
আরেক অভিভাবক মোছা. জরিনা বেগম বলেন, নিরাপদ পানির অভাব ও অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসে ঘাটতির কারণে পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ছোটখাটো অসুস্থতাকে গুরুত্ব না দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব করা হয়, যা পরবর্তীতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
উদ্বেগজনকভাবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কিছু শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য ও নেশাজাতীয় অভ্যাসের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। খারাপ সঙ্গ, সামাজিক অবহেলা ও সচেতনতার অভাবে এ প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
টিকাদান কর্মসূচি বিষয়ে গবেষণায় দেখা যায়, সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও এখনো কিছু শিশু সম্পূর্ণ টিকা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র দূরে থাকা, তথ্যের অভাব এবং পারিবারিক অবহেলা এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি শিশুস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তারা শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, খেলাধুলা ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গবেষক শিক্ষার্থীরা শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। তারা নিয়মিত স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
গবেষকদের মতে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও সঠিক বিকাশের ওপর। তাই চর মানিহার আদর্শ গ্রামের শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, সময়মতো চিকিৎসা ও মাদকমুক্ত সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।