বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
ইতিহাসে শ্রদ্ধাভড়ে স্মরনীয় থাকবে ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম

ইতিহাসে শ্রদ্ধাভড়ে স্মরনীয় থাকবে ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম

তিমির বনিক

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ইতিহাসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর নাম। তিনি ছিলেন কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান, একজন বীর সেনা কর্মকর্তা, সমাজসংস্কারক এবং নির্লোভ জননেতা। তাঁর পুরো জীবন ছিল দেশপ্রেম, সততা, মানবসেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১৯১৪ সালের ১৪ই জুন আসামের কাছাড় জেলার শান্তি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মণিপুরী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নেতৃত্বগুণে অনন্য। কর্মজীবনের শুরুতে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন মর্যাদাপূর্ণ কিংস কমিশন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে ১৯৫৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর তাঁর সামনে খুলে যায় ক্ষমতা ও বিলাসবহুল জীবনের নানা সুযোগ। পাকিস্তান সরকার তাঁকে ঢাকার বিজয় স্মরনীতে এক বিঘা জমি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সেখানে অভিজাত জীবন গড়ার সুযোগ থাকলেও তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন আমি গ্রামের মানুষ, গ্রামেই থাকতে চাই।

শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান তাঁকে কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু জনগণের সেবাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম সেই প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের প্রকৃত সেবা রাজধানীতে বসে নয়—মানুষের পাশে থেকেই করা যায়। ক্ষমতা, পদ কিংবা অর্থের প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। তাই তিনি চলে আসেন স্বজাতি মণিপুরী মুসলিম আত্মীয়-স্বজনের বন্ধনে আদমপুরের পূর্ব কোনাগাঁও গ্রামে। সেখানে তিনি আনারস বাগান প্রতিষ্ঠা করেন এবং এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৬০ সালের ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে তিনি আদমপুর ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালেও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে আদমপুর ইউনিয়ন শিক্ষা, যোগাযোগ ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তে পৌঁছে যায়। রাস্তা নির্মাণ, মসজিদ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা বিস্তার ও কৃষি উন্নয়নে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তেতইগাঁও পাবলিক হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি মাটির ঘরে থাকতেন, বাইসাইকেল চালিয়ে মানুষের খোঁজখবর নিতেন এবং নিজ হাতে উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতেন। আজও আদমপুরের মানুষ তাঁকে স্মরণ করে একজন সৎ, সাহসী ও জনদরদী নেতা হিসেবে।

ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী শুধু একজন ব্যক্তি নন—তিনি আদমপুরের ইতিহাসে এক জীবন্ত কিংবদন্তি, এক অনুপ্রেরণার নাম।

জীবনীগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ;

ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর গৌরবময় জীবন, সংগ্রাম ও সমাজসেবামূলক অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তাঁর জীবনী সংগ্রহ ও লেখার উদ্যোগ নিয়েছেন আদমপুরের সাংবাদিক শাব্বির এলাহী। আশা করা হচ্ছে, তাঁর উদ্যোগে প্রকাশিত হবে ক্যাপ্টেন ইব্রাহিমের একটি স্মারক জীবনীগ্রন্থ, যেখানে উঠে আসবে তাঁর জীবনের অজানা অধ্যায়, ত্যাগ, সংগ্রাম ও সমাজ উন্নয়নের ইতিহাস। এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতায় থাকবেন আমি রফিকুল ইসলাম জসিম। পাশাপাশি এই কাজের সফল বাস্তবায়নের জন্য সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করা।

প্রধান উপদেষ্টা : ইমাম হোসেন, নয়া সংবাদ মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ৩৩, তোপখানা রোড, রমনা, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত.

প্রিন্ট করুন