ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে দীর্ঘ ২৫ দিনের ছুটি পেয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একটানা ক্লাস, পরীক্ষা আর ব্যস্ততার ক্লান্তি ভুলে শিক্ষার্থীরা এখন নাড়ির টানে বাড়ির পথ ধরেছেন। ঈদ মানেই পরিবারের সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, মায়ের হাতের রান্না আর পুরনো বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠা। ক্যাম্পাস জীবনের ব্যস্ততা শেষে এই ছুটি শিক্ষার্থীদের মাঝে এক দারুণ মানসিক প্রশান্তি নিয়ে এসেছে।
ঈদের ছুটিকে ঘিরে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নানা অনুভূতি ও ভাবনা তুলে ধরেছে নয়া সংবাদের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইমরান হোসেন ইফরান।
ঈদ মানেই আনন্দ। আর যারা বাড়ি থেকে দূরে থাকে, তাদের জন্য এই আনন্দটা যেন একটু বেশিই গভীর। হলের একই স্বাদহীন খাবার দিনের পর দিন খেতে খেতে যখন খুব করে মায়ের হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে, তখনও ইচ্ছে থাকলেও হুট করে বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠে না। ক্যাম্পাসে ছুটি হওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকেই মনটা আর সেখানে পড়ে থাকতে চায় না। সকালে অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙে যায়। তাড়াহুড়ো করে সব গুছিয়ে বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া।
শেষমেষ যখন রিকশা থেকে নেমে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়া হয়, আর মা দরজা খুলে আবেগভরা চোখে তাকিয়ে বলেন, ‘এসেছিস বাবা?’—সেই মুহূর্তটার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। একটু বিশ্রামের পর মায়ের হাতের মজার মজার রান্না, পরিবারের সবার সাথে গল্প—এ যেন বহুদিনের ক্লান্তি এক মুহূর্তেই দূর হয়ে যাওয়া। ঈদে বাবা চাচারা খুব ব্যস্ত গরুর হাটে গরু কেনাকাটায়, মায়েরা ব্যস্ত কুরবানীর মসলা তৈরি করায়, আর স্কুল-কলেজের বন্ধুরা সব ব্যস্ত ক্রিকেট ফুটবল টুর্নামেন্টে। ঈদের ছুটি শুধু একটা ছুটি নয়। মা-বাবার কাছে, পরিবারের কাছে, বন্ধুদের কাছে, আর ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছে ফিরে যাওয়ার এক গভীর অনুভূতির নাম—বাড়ি ফেরা।
রাদিল চৌধুরী, পরিসংখ্যান বিভাগ
ক্যাম্পাস ছুটির বিষয়ে আমার অনুভূতিটা বড্ড অদ্ভুত। ক্যাম্পাস খোলা থাকলে মিড, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনের চাপে বড্ড ক্লান্ত লাগে। তাই ছুটি কাছে আসলেই মনে হয়—কবে বাড়ি গিয়ে মা-বাবার যত্ন আর মায়ের হাতের খাবারের স্বাদ পাবো! ছুটি মানেই একাডেমিক প্রেশার থেকে সাময়িক মুক্তি। যদিও কিছুদিন পর আবার ক্যাম্পাসের ক্লাস, বন্ধুদের আড্ডা আর কালচারাল ইভেন্টগুলোর কথা মনে পড়তে থাকে। এভাবেই দীর্ঘ দিনের ছুটিগুলো পরিবার ও এলাকার বন্ধুদের সাথে আনন্দেই কেটে যায়।"
অনেকদিন পর বাড়ি ফিরলে মায়ের মুখে 'কত রোগা হয়ে গেছিস, ঠিকঠাক খাস না'—এমন আদরমাখা কথা শুনতে বড্ড ভালো লাগে। আমি বাড়ি আসার আগে থেকেই মা পছন্দের খাবার রান্নার আয়োজন করেন, বাবা কিনে রাখেন প্রিয় সব ফল। মূলত, বাবা-মায়ের এই অকৃত্রিম আদর-ভালোবাসা আর বন্ধুদের সাথে খুনসুটি—এই সবকিছু মিলিয়েই আমার কাছে 'ছুটি'।
সুস্মিতা রয়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
মুসলমানদের জন্য দুটি ঈদের দিন আনন্দে কাটানো সুন্নাত। একেক জনের কাছে বাড়ি ফেরার আনন্দটা একেক রকম হলেও নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পছন্দ করায় ময়মনসিংহে নতুন টিউশন নেওয়ায় এবার সবার সাথে বাসে যাওয়ার স্বাদ পাইনি; রয়ে গেছি একা ক্যাম্পাসে, উপলব্ধি করেছি দায়িত্বের কঠোরতা। জীবনের কঠিন সময়গুলো আমাদের অকল্পনীয় বাস্তবতা মানিয়ে নিতে বাধ্য করে। তবে কাজ শেষ করার পরদিন সকালেই বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।
বাড়িতে বড় বোন ও ছোট ভাইকে একসাথে দেখে ঈদের আগেই ঈদ অনুভূতি চলে এসেছিল। মায়ের জমিয়ে রাখা গাছের ফল ও পছন্দের রান্না খাওয়া এবং বন্ধুদের সাথে বেড়ানোর পরিকল্পনার মাঝেও ক্লাসমেট ও রুমমেটদের মিস করি। পরিবার আসলে আমাদের কাছে "হিলিং স্টেশন"। গরুর হাট, পশু কুরবানির ব্যস্ততা, আত্মীয় ও দান-সদকা সব মিলিয়ে কুরবানির ঈদ মানে আনন্দ আর ত্যাগের সংমিশ্রণ। এই আনন্দের সাথে সব পরিবেশে টিকে থাকার তালিম নিয়ে আমরা আবার ক্যাম্পাসে ফিরি এবং শুরু হয় নতুনভাবে ভালো থাকার লড়াই।
রৌশন আরা আক্তার বিথী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
ছুটি ঘোষণার পর থেকেই এক অদ্ভুত আনন্দ কাজ করছিল। বাড়ি থেকে মা-বাবা বারবার ফোন করে সাবধানে আসার কথা বলছিলেন, আর ছোট বোনের একটাই দাবি ছিল—'আপু, তাড়াতাড়ি আসো।' পরদিন ভোরে যখন বাসে উঠলাম, জানালার পাশে বসে বাইরের সবুজ মাঠ আর খোলা আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল—এতদিন পর যেন নিজের চেনা পৃথিবীতেই ফিরে যাচ্ছি।
কাউকে না জানিয়ে আচমকা বাড়ি গিয়েছিলাম। ছোট বোনটা আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠলো—'আম্মু, আপু আসছে!' মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন। সেই মুহূর্তের শান্তি আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার কাছে ঈদের ছুটি মানে শুধু নতুন জামা বা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর চেয়েও বড় আনন্দ হলো—অনেকদিন পর মায়ের পাশে বসে গল্প করা, ভাই-বোনের সাথে খুনসুটি, নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমানো আর পরিবারের সাথে কাটানো প্রতিটি ছোট ছোট মুহূর্ত। এই অমূল্য অনুভূতিগুলোই একজন ঘরমুখো শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
খাদিজা আক্তার কলি, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ
ঈদের আনন্দ যতটা না দেখা যায়, তার চেয়েও বেশি আনন্দ দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার উচ্ছ্বাসে। যাদের বাড়ি উত্তরবঙ্গ কিংবা দক্ষিণবঙ্গে—তারা বাড়ি ফেরার জন্য কতটা মুখিয়ে থাকে! কেউ কেউ ছুটি শুরুর আগেই কয়েকটি ক্লাস মিস দিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়ে যায়। আস্তে আস্তে সবাই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেলে ক্যাম্পাস ফাঁকা পড়ে যায়, তখন মনে পড়ে " কোথাও কেউ নেই" নাটকের কথা।ক্যাম্পাস নির্জন হওয়ার পর আমিও বাড়ির পথে রওনা হই। বাড়িতে এসে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর মায়ের হাতের রান্নার কথা তো আলাদা করে বলারই অপেক্ষা রাখে না। হলের খাবার খেয়ে শুকিয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে যখন বাসায় ফিরি, তখন মা পাশে বসে যত্ন করে খাওয়ান। সেই মমতা মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তির জায়গাটা আসলে পরিবার।
আবার যখন ক্যাম্পাসে ফেরার সময় হয়, আমি একটু আগেই ফিরে যাই। এরপর একে একে সবাই যখন ক্যাম্পাসে ফিরতে শুরু করে, তখন মনে হয় যেন আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে চারপাশ। প্রিয় মানুষগুলো আবার ফিরে আসছে, আর আমি যেন তাদের স্বাগত জানাচ্ছি—সেই অনুভূতিটাও ভীষণ সুন্দর। এভাবেই ঈদের ছুটির আনন্দ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। সবাইকে পবিত্র ঈদুল আজহার আন্তরিক শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।
মাহফুজ আনআম শারফি, মার্কেটিং বিভাগ