জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্যসংকট ও অসম্পূর্ণতার বিষয়টি সামনে এসেছে। সম্প্রতি নতুন একটি ওয়েবসাইট চালু করা হলেও তথ্যগত সীমাবদ্ধতা, অসম্পূর্ণতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে তা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ব্যবহারকারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। এছাড়াও নতুন সাইট চালুর পরও পুরোনো ওয়েবসাইটটি বন্ধ না করায় ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
নতুন ওয়েবসাইটে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি, ভিশন-মিশন, প্রশাসনিক কাঠামো, অনুষদ ও বিভাগের তালিকা, নোটিশ বোর্ড এবং সংবাদ ও ইভেন্টসহ বেশ কিছু মৌলিক তথ্য স্থান পেয়েছে। এছাড়া পরীক্ষা, ছুটি সংক্রান্ত নোটিশ ও ডাউনলোডের সুবিধা যুক্ত করা হলেও একাডেমিক বিস্তারিত তথ্যের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বিভাগভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস, কোর্স আউটলাইন কিংবা ক্রেডিট কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাত্তগুলো ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
শিক্ষক ও গবেষণা সংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতি থাকায় ওয়েবসাইটটি গবেষণামুখী ব্যবহারকারীদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়ক নয়, কারণ অনেক বিভাগেই শিক্ষকদের বিস্তারিত প্রোফাইল বা প্রকাশনার তথ্য অনুপস্থিত। একই সাথে আধুনিক ডিজিটাল সেবা যেমন: সমন্বিত স্টুডেন্ট পোর্টাল, অনলাইন কোর্স রেজিস্ট্রেশন, উপস্থিতি ও ফলাফল ব্যবস্থাপনা এখানে অত্যন্ত সীমিত। এছাড়া ক্যারিয়ার, ইন্টার্নশিপ, অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক ও উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত তথ্যের অভাব রয়েছে। জটিল তথ্য বিন্যাসের কারণে একাধিক মেনু ঘুরে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে ব্যবহারকারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থী খাদিজা আক্তার কলি বলেন, "বর্তমান সময়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট শুধু তথ্য প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের একটি অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের-ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্যের পর্যাপ্ততা ও উপস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে।অনেক গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও বিভাগীয় তথ্য থাকে না। ওয়েবসাইটে অনেকসময় গুরুত্বপূর্ণ বা প্রয়োজনীয় নোটিশ খোঁজে পাওয়া যায় না। এছাড়াও বিভাগগুলোর তথ্য এবং শিক্ষকদের প্রোফাইল পাওয়া যায় না। পাশাপাশি হলসংক্রান্ত তথ্য, আসন ব্যবস্থা সহজে পাওয়া যায় না, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সময়ে অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। আমি মনে করি ওয়েবসাইটিকে আধুনিক এবং তথ্যসমৃদ্ধ করে শিক্ষার্থী-বান্ধব করা এখন সময়ের দাবি।"
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মীর রিয়া বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় সব তথ্য নিয়মিত আপডেট না করার কারণে আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের নোটিশ, রুটিন আর জরুরি তথ্য পেতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ওয়েবসাইটে যদি সব বিভাগের তথ্য, আপডেটেড নোটিশ এবং একাডেমিক কার্যক্রম সহজভাবে যুক্ত করা থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে অনেক উপকৃত হবে।"
তিনি আরো বলেন, "ওয়েবসাইটে ঢুকতে সমস্যা হওয়া, এর কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় নোটিশ না পাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তাই দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের কাঠামোগত উন্নয়ন করা এবং নিয়মিত সব তথ্য আপডেট করা এখন সময়ের দাবি।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মাহাবুব শাকিল বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে গবেষণা ও প্রকাশনা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষকদের পেইজও নিয়মিত আপডেট হয় না। পাশাপাশি ওয়েবসাইটের গতি ধীর ও ডিজাইন ব্যবহারবান্ধব না হওয়ায় তথ্য খুঁজতে ভোগান্তি পোহাতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মতে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে আইডি ও পাসওয়ার্ডভিত্তিক স্টুডেন্ট পোর্টাল থাকা উচিত, যেখানে লগইন করে আমরা সহজেই আমাদের রেজাল্ট ও মার্কশিট ডাউনলোড করতে পারবো। পাশাপাশি শিক্ষকদের পেইজগুলো নিয়মিত আপডেট করে তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংযুক্ত করা দরকার। ওয়েবসাইটের স্পিড বাড়ানো এবং এটিকে আরও ইউজার-ফ্রেন্ডলি করা জরুরি, যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত ও সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটই মূলত সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে, তাই এটি তথ্যসমৃদ্ধ ও আধুনিক হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ওয়েবসাইটটির উন্নয়ন কাজ আগের টেন্ডারের মাধ্যমেই শেষ হয়েছিল, বর্তমান প্রশাসন শুধু তা উদ্বোধন করেছে। তবে সম্পন্ন হতে কিছু কাজ এখনো চলমান রয়েছে। আমরা প্রতিটি বিভাগ ও দপ্তরকে আলাদা ইউজার আইডি দিয়েছি যাতে তারা নিয়মিত তথ্য আপডেট করতে পারে। শিক্ষকদের জন্যও লগইন সুবিধা রাখা হয়েছে। কোনো তথ্য ওয়েবসাইটে না থাকলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট ইউনিটের; তবে যেকোনো প্রযুক্তিগত সমস্যায় আইসিটি সেল সহায়তা প্রদান করবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ড্যাশবোর্ড না থাকলেও অটোমেশন প্রক্রিয়া চলছে। এটি সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীরা অনলাইনেই তাদের ফলাফলসহ সব একাডেমিক তথ্য দেখতে পাবে।”
এছাড়া নতুন ওয়েবসাইটের চলমান কার্যক্রম সম্পন্ন হলে পুরাতন ওয়েবসাইটটি মুছে দেওয়া হবে।