বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
‘প্রগতিশীল শিক্ষক’ ব্যানারে গোবিপ্রবির জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিরোধী দুই আওয়ামীপন্থী শিক্ষকের আন্দোলন

‘প্রগতিশীল শিক্ষক’ ব্যানারে গোবিপ্রবির জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিরোধী দুই আওয়ামীপন্থী শিক্ষকের আন্দোলন

মো: আরমান মজুমদার

জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কটুক্তি এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের “রাজাকার শাবক” বলে সমালোচিত গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দুই শিক্ষক—সহযোগী অধ্যাপক জাকিয়া সুলতানা মুক্তা এবং সহকারী অধ্যাপক জয়নাব বিনতে হোসেন—সম্প্রতি ‘প্রগতিশীল শিক্ষক’ ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন।

বুধবার (১৩ মে) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে অনুষ্ঠিত ওই মানববন্ধনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রেফতার এবং বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হওয়া আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের মুক্তির দাবি জানানো হয়। মানববন্ধনে বিভিন্ন পেশার আওয়ামীপন্থী ব্যক্তিদের উপস্থিতিও দেখা গেছে বলে জানা যায়।

অংশগ্রহণকারী দুই শিক্ষক এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে কটুক্তি এবং “রাজাকার শাবক” মন্তব্য করার অভিযোগে সমালোচিত হন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তারা আলোচনায় আসেন বলে শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে।

মানববন্ধনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিজেদের ‘নির্যাতিত-নিপীড়িত শিক্ষক’ দাবি করে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা ‘প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ ব্যানারে নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন। অনলাইনে নিয়মিত সভা, সংবাদ সম্মেলন এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবসে কর্মসূচি পালন করে আসছেন তারা।

আত্মপ্রকাশের পর গত বছর জুলাই আন্দোলনের পর বহিষ্কার হওয়া শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরাতে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেয় এই প্ল্যাটফর্মটি। সর্বশেষ গত বছরের ১৭ নভেম্বর, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিলে ‘১০০১ জন’ শিক্ষক বিবৃতি দেন। এরপর থেকেই প্ল্যাটফর্মটি আরও আলোচনায় আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরোধিতাকারী, শিক্ষার্থীদের রাজাকার শাবক বলা শিক্ষক এখনো ক্যাম্পাসে আওয়ামী বন্দনা করছেন—এটা দুঃখজনক। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে গা ছাড়া ভাব না দেখানোর অনুরোধ।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক পরিষদের সদস্য সচিব সহকারী অধ্যাপক ড. এস এম আহসান বলেন, “আমার আসলে জানা নেই, তাদের যে সংগঠন সেটার মানববন্ধন বা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি আছে কি না। আর যদি আওয়ামী লীগের পক্ষে বা ফ্যাসিবাদের পক্ষে কোনো কার্যক্রম করে, তাহলে আমার বক্তব্য হচ্ছে উচ্চ কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসন যেন বিষয়টি দেখে। এই ধরনের বিতর্কিত ইস্যুতে বা বিচারাধীন বিষয়ে আমরা শিক্ষকদের আহ্বান করব, তারা যেন পরবর্তীতে না জড়ান।”

এ বিষয়ে ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলী তোহা বলেন, “গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষিকা জাকিয়া সুলতানা মুক্তা ও জয়নাব বিনতে হোসেনকে ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার সাথে জড়িত বেরোবির সাবেক ভিসি কলিমুল্লাহসহ কয়েকজন দোসরের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করতে দেখা যায়। এই ঘটনা অত্যন্ত লজ্জাজনক, আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”

তিনি আরও বলেন, “এই জাকিয়া সুলতানা মুক্তা ও জয়নাব বিনতে হোসেন ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাজাকার ও শাবক বলে গালি দেন। গোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। এমন কর্মকাণ্ড শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পরিপন্থী। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসরদের মুক্তি চাওয়া মানে জুলাই শহীদ ও আহতদের রক্তের সাথে বেঈমানি করা। এমন লজ্জাজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ থাকবে, যেসব শিক্ষকের মূল্যবোধ নেই এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।”

এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক জাকিয়া সুলতানা মুক্তা বলেন, “এটা একটা সাধারণ মানববন্ধন ছিল। হামে ৫০০ শিশু মারা গেছে সরকারি হিসাব মতে, বেসরকারি হিসেবে আরও বেশি। শুধু আমরা না, বিভিন্ন সংগঠন এ বিষয় নিয়ে মিছিল-মিটিং করেছে। হামে শিশু মারা যাচ্ছে, এটা অব্যবস্থাপনার ফলাফল। যারাই এই অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, বিষয়টি তদন্ত করে তাদের বিচারের সম্মুখীন করা উচিত। এটা স্বাভাবিক একটা মানববন্ধন, এটা তো অপরাধ না। এটার সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের সম্পর্ক নেই। বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও সম্পর্কিত না।”

আওয়ামীপন্থী শিক্ষক অভিযোগের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “আওয়ামীপন্থী কোনো শিক্ষকদের ব্যানারে আমার নাম আছে কি না খুঁজে দেখেন। আর বঙ্গবন্ধু পরিষদের ব্যাপারে এটা আওয়ামীপন্থী বলা ঠিক না, এটা বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে গবেষণার একটি পরিষদ। সেই পরিষদে আমার খুব বেশি অ্যাক্টিভিজম ছিল না।”

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আরেক শিক্ষক জয়নাব বিনতে হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকেও ফোনে পাওয়া যায়নি।

প্রধান উপদেষ্টা : ইমাম হোসেন, নয়া সংবাদ মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ৩৩, তোপখানা রোড, রমনা, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত.

প্রিন্ট করুন