গুজবের ভয়াবহ পরিণতিতে জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারালেন ট্রাকচালক হান্নান শেখ। আর তার সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের আলো। সবচেয়ে করুণ বাস্তবতায় পড়ে গেছে তার ২৫ মাস বয়সী কন্যা মুসলিমা ইসলাম—যে এখন পুরোপুরি মা-বাবাহীন।
শনিবার (২ মে) বিকেলে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামে নিহত হান্নান শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। শোকের মাতমে ভারী হয়ে আছে চারপাশ।
স্বজনদের কান্নার ভিড়ের মাঝেই কিছু না বুঝে কখনো দাদীর কোলে, কখনো অন্যের কোলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট্ট মুসলিমা। কখনো ফিডারে দুধ খাচ্ছে, আবার হঠাৎ কেঁদে উঠছে—যেনো অজানা এক শূন্যতা তাকে ঘিরে রেখেছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় মায়ের স্নেহ হারায় মুসলিমা। তার মা আরিফা বেগম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে দাদা শাহিদ শেখ ও দাদী নার্গিস বেগমই নাতনিটিকে আগলে রেখেছেন।
নিহতের মা নার্গিস বেগম ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, “মা জন্মের কিছুদিন পরই চলে গেছে, এখন বাবাও নেই। আমার নাতনিটা একেবারে অসহায় হয়ে গেল। আমি মরে গেলে ওর কী হবে?”
একই সুরে আক্ষেপ করেন নিহতের বাবা শাহিদ শেখ। তিনি বলেন, “আমার ছেলে ছিল সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী। কোনো ভুল করলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এখন এই শিশুর ভবিষ্যৎ কে দেখবে?”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার (১ মে) রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় একটি দ্রুতগতির ট্রাক কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেয়—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে “ট্রাকটি বহু মানুষকে চাপা দিয়েছে” এমন গুজব মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা সড়ক অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়।
একপর্যায়ে চালক হান্নান শেখকে ট্রাক থেকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার—নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫)—আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
পরিবারের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে হান্নানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়দের একাংশ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগ তুললেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
এদিকে সবচেয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে ছোট্ট মুসলিমার ভবিষ্যৎ। মা-বাবাহীন এই শিশুটির দায়িত্ব এখন বৃদ্ধ দাদা-দাদীর কাঁধে, যা দীর্ঘমেয়াদে বহন করা তাদের পক্ষে কতটা সম্ভব—তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর শঙ্কা।
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
একটি গুজব, এক মুহূর্তের উন্মত্ততা—আর তার মূল্য দিতে হচ্ছে একটি নিষ্পাপ শিশুকে, যে বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে ফেলেছে তার পুরো পৃথিবী।