১৯৯১ সালের মে মাস। আফ্রিকার তপ্ত মরুভূমির দেশ নামিবিয়া তখন মাত্রই দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পর বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের এক নতুন ঢেউ শুরু হয়। সেই সময় নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহুক শহরের এক কনফারেন্স রুমে জড়ো হয়েছেন একদল লড়াকু সাংবাদিক।
আফ্রিকার সেই উত্তাল সময়ে তারা অনুভব করেছিলেন স্বাধীন সাংবাদিকতার গুরুত্ব। ২৯ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত চলা সেই সেমিনারে জন্ম নিল এক ঐতিহাসিক দলিল ‘উইন্ডহুক ঘোষণা’।
তারা ঘোষণা করলেন, " একটি স্বাধীন, বহুত্ববাদী এবং মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা, রক্ষণাবেক্ষণ ও লালন করাই হলো কোনো জাতির গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি।"
উইন্ডহুকের সেই সাহসের প্রতিধ্বনি পৌঁছাল সুদূর প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে। সাংবাদিকদের সেই দাবিকে বিশ্বজনীন রূপ দিতে ইউনেস্কো সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ পাঠালো।
অবশেষে ১৯৯৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩ মে তারিখটিকে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৪ সাল থেকে পৃথিবীজুড়ে পালিত হতে শুরু করল এই দিবস।
তাত্ত্বিকভাবে গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কিন্তু অট্টালিকা যেমন নড়বড়ে স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তেমনি রাষ্ট্রও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া বিকশিত হতে পারে না। এই স্তম্ভের প্রকৃত শক্তি কোনো পেশিশক্তি বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে নয়, বরং লুকিয়ে থাকে এর স্বাধীনতায়। গণমাধ্যম যখন শিকলবন্দি হয়, তখন নিপীড়িতের আর্তনাদ আরও ভারী হয়ে ওঠে, আর শোষকের হাত হয় দীর্ঘ।
আজকাল খবরের কাগজ খুললেই আমাদের চোখে পড়ে শত অনিয়ম, জুলুম আর নিপীড়নের বাস্তব চিত্র। কাগজের প্রতিটি অক্ষর যেন সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সেই কাগজের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে ইতিহাসের পাতায় তুলে আনেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবলই সাংবাদিকদের অধিকার নয়, এটি সাধারণ মানুষের জানার অধিকারের নিশ্চয়তা।
গনমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নোবেলবিজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং দার্শনিক আলবেয়ার কামু বলেছিলেন "একটি মুক্ত সংবাদপত্র সবসময় ভালোও হতে পারে আবার মন্দও হতে পারে। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে, স্বাধীনতা ছাড়া সংবাদপত্র কেবলই মন্দ হয়ে ওঠে।"
একটি কলম যখন কোনো রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাদা কাগজে তার কালি ঢেলে দেয়, তখন সেখানে কেবল কিছু সংবাদ জন্ম নেয় না। সেখানে জন্ম নেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদম্য প্রতিবাদের ভাষা, এক নীরব বিদ্রোহের কবিতা। ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আমাদের সেই সত্যটিই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৯১ সালের 'উইন্ডহুক ঘোষণা' থেকে শুরু করে আজকের প্রেক্ষাপট,স্বাধীন সাংবাদিকতার লড়াইটি চিরকালই ছিল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শব্দের লড়াই।
সাংবাদিকতার এই মহান ব্রত শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণ থেকেই। ক্যাম্পাসের ধুলোবালিতে মিশে থাকা অজস্র অনিয়ম আর স্বপ্নের গল্পগুলো সাহসের সাথে তুলে ধরেন ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা পর্দার আড়ালের দুর্নীতি, সবই তাদের কলমে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তবে এই পথটি মোটেও সহজ নয়। একজন তরুণ সাংবাদিককে প্রায়ই প্রশাসনিক চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা সহপাঠীদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়। সত্য তুলে ধরার অপরাধে জুটতে পারে হুমকি কিংবা সামাজিক লাঞ্ছনা। তবুও তাদের কলম থামে না। কারণ তারুণ্যের অভিধানে 'পিছুটান' বলে কোনো শব্দ নেই।
তাই অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক না কেন, কলমের ডগায় যে স্ফুলিঙ্গ থাকে, তা একদিন ঠিকই সূর্যোদয় ছিনিয়ে আনে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের প্রত্যাশা গণমাধ্যম হোক শৃঙ্খলমুক্ত, কলম হোক নির্ভীক। সত্যের এই অভিযাত্রায় আমরা যেন কখনো পথ না হারাই।